BSSAJ Logo
BSSAJ
Published
Approved

একটা QR কোড, আর ফাঁস হয়ে যাচ্ছে পুরো পরিচয়

MN
MD NAZIM UDDIN
August 31, 2026Updated August 31, 2026

জাপানে পড়তে যাওয়ার ফাইল যাঁরা একবার গুছিয়েছেন, তাঁরা জানেন সেখানে কী কী থাকে — স্পন্সরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আয়কর সনদ, ইনকাম সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্স। কাগজগুলো ফটোকপি হয়, স্ক্যান হয়, ইমেইলে যায়, আবার প্রিন্ট হয়। একটা ফাইল বাস্তবে আট-দশ জায়গায় পৌঁছায়। আমরা সবাই খেয়াল রাখি কাগজে তথ্যটা ঠিক আছে কি না, সিল-স্বাক্ষর ঠিকঠাক বসেছে কি না। কিন্তু কাগজের কোণায় ছাপা ছোট্ট QR কোড বা বারকোডটার দিকে কেউ তাকাই না।

আমি একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার। কোডটার দিকে তাকানোই আমার অভ্যাস। আর সেখানেই একটা ব্যাপার চোখে পড়েছে, যেটা নিয়ে কথা বলা দরকার বলে মনে করছি।

কোডটা আসলে কী খুলে দেয়

ডিজিটাল যাচাইয়ের ধারণাটা চমৎকার। একটা সনদ আসল না নকল, সেটা মিনিটে বুঝে ফেলা যায় — এটা নিঃসন্দেহে অগ্রগতি। সমস্যা হলো, যাচাই করতে গিয়ে কতটুকু দেখানো হচ্ছে, সেই সীমাটা কোথাও টানা হয়নি।

অনেক ক্ষেত্রে স্ক্যান করলেই সামনে চলে আসে নাম, ঠিকানা, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর, আয়ের বিবরণ — এবং মূল ডকুমেন্টের পিডিএফটাও নামিয়ে নেওয়া যায়। কোনো লগইন নেই, কোনো OTP নেই, কোড ব্যবহারের কোনো মেয়াদও নেই। যিনি কাগজটা হাতে পেয়েছেন, তিনিই সব পেয়ে গেলেন। কিছু ব্যাংকের স্টেটমেন্টেও একইভাবে QR বসানো আছে।

এখানে স্পষ্ট করে বলে রাখি — এই লেখায় কোনো নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট, লিংক বা পদ্ধতির কথা ইচ্ছাকৃতভাবে বলিনি। উদ্দেশ্য সচেতনতা তৈরি করা, দুর্বলতা দেখিয়ে দেওয়া নয়।

একটা কাগজ কতজনের হাত ঘোরে

একজন শিক্ষার্থীর ফাইলের কথাই ধরুন। কাগজ যায় এজেন্সি অফিসে, তারপর স্ক্যান করার দোকানে, তারপর ইমেইলে ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সেখান থেকে জাপানের ইমিগ্রেশনে, আবার ভিসা আবেদনের সময় আরেক দফা। মাঝখানে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো, পেনড্রাইভে নেওয়া, অফিসের কম্পিউটারে জমে থাকা কপিগুলো তো আছেই।

এর একটা ধাপেও কেউ খারাপ উদ্দেশ্যে থাকতে হবে না। শুধু একটা অসাবধান কপি, একটা অরক্ষিত ফোল্ডার, বা হারিয়ে যাওয়া একটা প্রিন্ট — ব্যস, কোডটা এখন অচেনা কারও হাতে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষতিটা কেমন দাঁড়ায়

"পরিচয় জালিয়াতি" কথাটা শুনতে দূরের বিষয় মনে হয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে এটা কীভাবে ঘটে, একটু ভেঙে বলি।

  • ফাইল নকল করা সহজ হয়ে যায়। একজনের আর্থিক নথির তথ্য দিয়ে আরেকজনের ফাইল সাজানোর চেষ্টা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আসল ডকুমেন্ট হুবহু নামিয়ে নেওয়া গেলে নকল করার পরিশ্রমটুকুও আর লাগে না।
  • প্রতারণার ফোন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সাধারণ স্ক্যাম কল মানুষ ধরে ফেলে। কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ যদি আপনার TIN, আয়ের অঙ্ক, ব্যাংকের নাম, বাড়ির ঠিকানা — সব গড়গড় করে বলে দেয়, তখন সন্দেহ করার কথা মাথাতেই আসে না। সবচেয়ে বড় বিপদ তথ্য ফাঁস হওয়া নয়; ফাঁস হওয়া তথ্য দিয়ে আস্থা তৈরি করা।
  • অভিভাবক টার্গেট হয়ে যান। একজন স্পন্সরের ব্যাংকে কত টাকা আছে, সেটা অচেনা কেউ জানলে ঝুঁকিটা কেবল ডিজিটাল থাকে না। মফস্বলে বা গ্রামে একটি পরিবারকে "টাকাওয়ালা" হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলার পরিণতি আমরা সবাই জানি।
  • ফেসবুকে পোস্ট করার অভ্যাস। ভিসা পেলে, সনদ পেলে ছবি তুলে পোস্ট করা আমাদের এক ধরনের রীতি হয়ে গেছে। অনেকে সাবধান হয়ে নাম বা নম্বর ঝাপসা করে দেন — কিন্তু কোডটা ঝাপসা করেন না। ওখান দিয়েই পুরোটা বেরিয়ে যায়।
  • ক্ষতি হয়ে গেলে প্রতিকারের পথ সরু। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো এখনো গড়ে ওঠার পর্যায়ে। ফলে তথ্য ফাঁস হলে ভুক্তভোগী কোথায় যাবেন, কে দায় নেবে — উত্তরটা পরিষ্কার নয়।

জাপানে বিষয়টা কীভাবে দেখা হয়

জাপানে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (個人情報保護法) অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান কারও তথ্য সংগ্রহ করলে সেটা কেন নিচ্ছে, কতদিন রাখবে, কার সঙ্গে ভাগ করবে — সব জানাতে বাধ্য। ভুল হলে জবাবদিহি করতে হয়।

এটা বলছি কোনো তুলনা করে ছোট করার জন্য নয়। বলছি এই কারণে যে, আমাদের শিক্ষার্থীদের নথি দুই দেশের ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই যায়। এক প্রান্তে যতই কড়াকড়ি থাকুক, শুরুর প্রান্তে ফাঁক থেকে গেলে ঝুঁকিটা রয়েই যায়।

সমাধান কিন্তু জটিল নয়

ব্যবস্থাটা ভেঙে ফেলার দরকার নেই। কয়েকটা ধাপ যোগ করলেই সুবিধাটা থাকে, ঝুঁকিটা থাকে না।

  • যাচাইয়ের সময় OTP — নথির মালিকের নম্বরে একটা কোড গেলে অন্তত তিনি জানতে পারবেন কে তাঁর তথ্য দেখছে।
  • কোডের মেয়াদ সীমিত রাখা — একটা সনদ পাঁচ বছর পরেও একইভাবে সব খুলে দেবে, এর কোনো কারণ নেই।
  • শুধু বৈধতা দেখানো — স্ক্যান করলে "এই ডকুমেন্টটি বৈধ" এটুকু দেখালেই যাচাইয়ের কাজ শেষ। পুরো তথ্যভাণ্ডার খুলে দেওয়ার দরকার পড়ে না।

যাচাইয়ের সুবিধা দেওয়া আর তথ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া — এক জিনিস নয়। পার্থক্যটা এখানেই।

আজ থেকেই যে তিনটি কাজ করতে পারেন

  1. কোনো সনদ, স্টেটমেন্ট বা কাগজের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবেন না — কোড থাকলে তো নয়ই। নাম ঢাকলেও কোড ঢাকা পড়ে না।
  2. ফাইলের কপি যেখানে পাঠাচ্ছেন, সেখানে কেন পাঠাচ্ছেন সেটা জেনে পাঠান। কাজ শেষে কপিটা মুছে ফেলতে বলুন।
  3. প্রিন্ট বা ফটোকপি যেখানেই করান, ছাপার দোকানের কম্পিউটার থেকে ফাইলটা মুছে দিতে বলুন। ছোট কাজ, কিন্তু কাজে দেয়।

বাসাজ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে, আর নথির নিরাপত্তাও সেই নিরাপত্তারই অংশ। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর আলোচনা শুরু করার চেয়ে, আগেই ভেবে রাখা ভালো।